বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বিজিএমইএর যৌথ সেমিনারে বক্তারা

পোশাক খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রধান শর্ত সার্কুলার অর্থনীতি

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাক খাতের অবস্থান ধরে রাখতে সার্কুলার অর্থনীতি এখন আর তাত্ত্বিক ধারণা নয়; বরং এটি টেকসই প্রবৃদ্ধি ও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রধান শর্তে পরিণত হয়েছে।

লিনিয়ার মডেল থেকে সরে এসে সম্পদের পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে উঠেছে। কারণ ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীরা ক্রমেই পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছেন। ফলে টেক্সটাইল বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করতে না পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়বে।

রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল ‘বাংলাদেশের বস্ত্রশিল্পে সার্কুলার (বৃত্তাকার) রূপান্তর ত্বরান্বিতকরণ: সুইচ টু সিই পাইলট প্রকল্পগুলো থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এ কথা বলেন। তৈরি পোশাক শিল্পে সার্কুলার ইকোনমির প্রসার এবং টেকসই শিল্পায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘বাংলাদেশে পোশাক খাতে সার্কুলার ইকোনমি বা বৃত্তাকার অর্থনীতি এখন আর কেবল একটি তাত্ত্বিক ধারণা বা উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়; বরং এটি একটি বাস্তবসম্মত ও অর্জনযোগ্য লক্ষ্য, যা এরই মধ্যে বাস্তবায়িত হচ্ছে। বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত পাইলট প্রকল্পগুলো প্রমাণ করেছে যে টেক্সটাইল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং রিসাইক্লিং পদ্ধতি আমাদের শিল্প ব্যবস্থায় কার্যকরভাবে যুক্ত করা সম্ভব।’

দেশের পোশাক খাতে একটি পদ্ধতিগত পরিবর্তনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববাজারে এখন সাসটেইনেবিলিটি বা স্থায়িত্বই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রধান শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে এমন উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছেন, যা একই সঙ্গে দক্ষ ও দায়িত্বশীল।’

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘টেক্সটাইল ও পোশাক খাত অত্যন্ত সম্পদ-নিবিড় হওয়ায় এখানে উপকরণের পুনর্ব্যবহার এবং রিসাইক্লিং নিশ্চিত করা জরুরি। এটি কেবল পরিবেশ রক্ষা করবে না; বরং আমাদের বৈশ্বিক অবস্থানকেও শক্তিশালী করবে।’ এ রূপান্তর সফল করতে সরকার, শিল্প খাত, গ্লোবাল ব্র্যান্ড এবং প্রযুক্তি সরবরাহকারীদের একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিশ্ব ফ্যাশন শিল্প এক নতুন বাস্তবতার দিকে মোড় নিতে শুরু করেছে। নতুন প্রজন্ম, তাদের ব্যবহৃত পণ্যের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে অত্যন্ত সচেতন। পোশাককে মানুষের ‘দ্বিতীয় চামড়া’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাই এটি হওয়া উচিত গ্লানি ও দূষণমুক্ত।’

আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো এখন টেকসই পণ্যের ব্যাপারে আগের চেয়ে অনেক বেশি সোচ্চার উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিশ্ব ফ্যাশন বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে এ বর্জ্যের একটি টেকসই সমাধান বের করা বাংলাদেশের জন্য বাধ্যতামূলক। তাই সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ হলো আমাদের ব্যবসায়িক মডেলে ‘সার্কুলারিটি’ অন্তর্ভুক্ত করা।’

বিজিএমইএ এ পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে জানিয়ে বিজিএমইএর সভাপতি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখতে শিল্পের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। ‘সার্কুলারিটি’ প্রতিযোগিতার পথে বাধা নয়, বরং এটি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার একটি পূর্বশর্ত।’

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেন, ‘আমাদের মাটি থেকে সম্পদ আহরণ করে এমন পণ্য তৈরি করা বন্ধ করতে হবে, যা আমরা ব্যবহার শেষে ল্যান্ডফিলে ফেলে দেই। এর পরিবর্তে আমাদের উচিত সেই সম্পদগুলো পুনরায় ব্যবহার করা। সম্পদ সাশ্রয় কেবল একটি পরিবেশগত বাধ্যবাধকতা নয়; বরং এটি একটি প্রবৃদ্ধি কৌশলও বটে।’

তিনি বলেন, ‘রিসাইক্লিং, উপকরণের বিকল্প ব্যবহার এবং সম্পদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি সরাসরি প্রতিষ্ঠানের খরচ কমায় এবং উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে। বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতি ও বাণিজ্য যখন ক্রমবর্ধমানভাবে অনিশ্চিত এবং জটিল হয়ে উঠছে, তখন এ সার্কুলার ইকোনমি আমাদের সার্বভৌমত্ব এবং শিল্প সক্ষমতা রক্ষায় সাহায্য করবে। আমরা একক কোনো দেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থাকে বৈচিত্র্যময় করছি।’

ইইউ রাষ্ট্রদূত আরো বলেন, ‘সার্কুলার ইকোনমির ক্ষেত্রে টেক্সটাইল ও পোশাক খাত আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ খাতে বর্জ্যের পরিমাণ বিশাল—ইইউতে বছরে ৫০ লাখ টনের বেশি পোশাক পরিত্যক্ত হয় এবং বাংলাদেশে বছরে প্রায় ছয় লাখ টন বর্জ্য তৈরি হয়। ফাস্ট ফ্যাশন এবং সামাজিক অবস্থার উদ্বেগের কারণে ইইউ ২০২২ সালে টেকসই এবং সার্কুলার টেক্সটাইল কৌশল গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ইকো-ডিজাইন, বর্ধিত উৎপাদক দায়বদ্ধতা এবং ডিজিটাল প্রডাক্ট পাসপোর্ট নিশ্চিত করার মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য। এছাড়া গত বছর আমরা করপোরেট স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে নতুন নীতিমালা গ্রহণ করেছি, যা জবাবদিহিতাকে আরো শক্তিশালী করবে।’

অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব (ভারপ্রাপ্ত) আবদুর রহিম খান, সুইচ টু সিইর চিফ টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার মার্ক ড্র্যাক, চ্যাথাম হাউজের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. প্যাট্রিক শ্রোডারসহ বিভিন্ন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, অংশীদার ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা।

আরও